০২ নভেম্বর, ২০২৫
ছবি: নরসিংদীর মনোহরদী-বেলাব অঞ্চলের রাজনীতিতে ফের আলোচনায় এসেছে সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল
নরসিংদীর মনোহরদী-বেলাব অঞ্চলের রাজনীতিতে ফের আলোচনায় এসেছে সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুলের নাম।
স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গন ও প্রশাসনিক মহলে তাঁর বিরুদ্ধে নানা অপকর্ম, ক্ষমতার অপব্যবহার, বালু ব্যবসা, চাঁদাবাজি এবং দলীয় দ্বিচারিতার অভিযোগে সরগরম হয়ে উঠেছে নরসিংদীর রাজনীতি।
আওয়ামী লীগের সঙ্গে বকুলের রয়েছে ‘আত্মার সম্পর্ক’। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সরদার বকুলের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সম্পর্ক শুধু রাজনৈতিক নয়—ছিল “আত্মার মতো ঘনিষ্ঠ”।
তিনি সাবেক শিল্পমন্ত্রী নুরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুনের মামাতো–ফুপাতো ভাই, এবং আওয়ামী লীগের শাসনামলে হুমায়ূনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে কাজ করেছেন। স্থানীয় সূত্র জানায়, বকুল আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ হয়ে বিভিন্ন প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা ভোগ করেন এবং সরকারি প্রভাব ব্যবহার করে এলাকায় একধরনের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন।
আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পরও বকুলের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, তিনি এখনো আওয়ামী লীগের বেশ কিছু নেতাকর্মীকে রক্ষা করতে সক্রিয় রয়েছেন। প্রশাসনিক তৎপরতা বা মামলার ঝুঁকিতে থাকা আওয়ামী লীগ নেতাদের পক্ষে বকুল নেপথ্যে সমন্বয়ের ভূমিকা রাখছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
সরদার বকুলের পরিবারের সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে।
তাঁর একমাত্র মেয়ের শ্বশুর আওয়ামী লীগের চিফ হুইপ ও পিরোজপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য আ.স.ম. ফিরোজ।
অন্যদিকে, তাঁর বড় বোনের ছেলে ফখরুল মান্নান মুক্ত চালাকচর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
এছাড়া, বড় ভাই মোয়াজ্জেম হোসেন বুলবুল ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে বকুল মনোহরদী ও বেলাব উপজেলার বিভিন্ন স্থানে অবৈধভাবে নদী থেকে বালু ও মাটি উত্তোলনের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার ব্যবসা চালিয়েছেন গোপনে।
অভিযোগ রয়েছে, ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর থেকে বকুল ও তাঁর সহযোগীরা প্রকাশ্যে নদী থেকে অবৈধভাবে বালু-মাটি উত্তোলন করে প্রায় ৫০ কোটি টাকার বেশি বিক্রি করেছেন।
এই ব্যবসার মাধ্যমে তিনি শুধু ব্যক্তিগত সম্পদই গড়েননি, বরং প্রশাসনিক কর্তাদের প্রভাবিত করে এলাকার সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি দেখিয়ে নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বকুল ও তাঁর অনুসারীরা বিভিন্ন সিএনজি স্টেশন, বাজার ও ইটভাটায় নিয়মিত চাঁদা তোলেন।
বিএনপির নাম ব্যবহার করে তিনি একধরনের চাঁদাবাজ নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এছাড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ইউনিয়ন পরিষদের বিভিন্ন পদে নিজের অনুগত ব্যক্তিদের মনোনীত করে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেন।
মনোহরদী উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব আমিনুর রহমান সরকার দোলনের মাধ্যমে একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সভাপতি ও বিদ্যুৎসাহী সদস্য নির্বাচিত করার অভিযোগও রয়েছে।
দোলনের এমএ পাস সনদ ভুয়া হওয়ায় কয়েকটি প্রতিষ্ঠান থেকে তাঁকে বাদ দেওয়া হয়।
বিএনপির কেন্দ্রীয় মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক সম্পাদক লে. (অব.) কর্নেল জয়নাল আবেদীন এর গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনাতেও বকুলের অনুসারীদের সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, মাদকাসক্ত ছোটন নামের এক ব্যক্তি, যিনি বকুলের ঘনিষ্ঠ, তাঁর নেতৃত্বে ওই হামলা চালানো হয়।
থানায় মব পরিচালনা করে ওসিকে জিম্মি করা এবং ত্যাগী বিএনপি নেতাদের মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করার অভিযোগও স্থানীয় রাজনীতিতে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেছে।
বকুল বিএনপির নেতা হলেও অতীতে আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ হিসেবে কাজ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
নরসিংদী জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক তোফাজ্জল হোসেন মাস্টার বলেন,
“ওয়ান-ইলেভেনের সময় বকুল বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানকে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন—‘নষ্ট মায়ের নষ্ট ছেলে’। একজন নেতা হয়েও তিনি দলের চরম ক্ষতি করেছেন।”
রাজনৈতিক মহলের দাবি, এই বক্তব্য ও আচরণ তাঁর স্বভাবসুলভ স্বৈরাচারী চরিত্র ও সুযোগসন্ধানী মনোভাবের পরিচয় দেয়।
বকুল অতীতে বিএনপি নেতা মান্নান ভূঁইয়ার অনুসারী ছিলেন এবং ২০০৭ সালের পর তিনি দলের ভেতরে বিভাজন তৈরিতে ভূমিকা রাখেন।
২০১৪ সালের পর তিনি কথিত ভূয়া ডিবি কর্মকর্তা এনায়েত করিমের সঙ্গে মিলে বিএনপি সংগঠন ধ্বংসের কাজ করেন।
বর্তমানে এনায়েত করিম কারাগারে থাকলেও এ সংক্রান্ত তদন্ত এখনও চলমান।
মনোহরদী-বেলাবর বিভিন্ন স্থানে এখন বকুলের নাম উচ্চারণ মানেই রাজনীতির ভেতরকার ক্ষমতার দ্বন্দ্বের প্রতীক।
কেউ তাঁকে “চতুর রাজনীতিবিদ” বললেও, অনেকের মতে সরদার বকুল রাজনীতিকে নয়, ক্ষমতা ও টাকার খেলা হিসেবে ব্যবহার করেছেন বছরের পর বছর।
বকুলের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ বিষয়ে একাধিকবার মোবাইলে যোগাযোগ করা হলেও তাঁর কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।