১২ মে ২০২৬
হোম স্বাস্থ্য সারাদেশ জাতীয় রাজনীতি অর্থনীতি ও বাণিজ্য খেলাধুলা বিনোদন আন্তর্জাতিক ধর্ম ও জীবন লাইফ স্টাইল শিক্ষা প্রযুক্তি ও বিজ্ঞান পরিবেশ চাকরি বা ক্যারিয়ার মতামত আইন-আদালত কৃষি ও প্রযুক্তি বিশেষ সংবাদ অপরাধ সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিশ্বকাপ ফুটবল
সারাদেশ / স্বাস্থ্য

কক্সবাজার হামের ভয়াবহ তীব্রতায় ২০ বেডে ৮৭ শিশু

১২ মে, ২০২৬

কাজল কান্তি দে,
কক্সবাজার জেলা (কক্সবাজার) প্রতিনিধি

ছবি: কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতাল

কক্সবাজারে ভয়াবহ আকার নিয়েছে হাম। জেলা সদর হাসপাতালের ২০ বেডের বিশেষ ‘হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে’ সোমবার ভর্তি ৮৭ শিশু, যা কখনো কখনো ছাড়িয়েছে ১১০ জন। জায়গা সংকটে মেঝেতেই চলছে চিকিৎসা। চিকিৎসক-নার্স সংকটের মধ্যেই বাড়ছে রোগীর চাপ। এর মধ্যে ৪২৪ জনের নমুনা পরীক্ষায় ১১৯ জনের শরীরে হামের সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে। আর গত ৪০ দিনে জেলায় মারা গেছে ১৭ জন।

কক্সবাজার সদর হাসপাতালের ‘হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে’ সরেজমিন দেখা যায়, একটি বেডে ঠাঁই হয়েছে ২ থেকে ৪ শিশুর। কোথাও মেঝেতে, কোথাও স্বজনের কোলেই চলছে চিকিৎসা। অসুস্থ সন্তানকে নিয়ে ওয়ার্ডজুড়ে ছুটে বেড়াচ্ছেন উদ্বিগ্ন অভিভাবকরা।

কক্সবাজারের সর্বোচ্চ সরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান জেলা সদর হাসপাতাল। ২৫০ শয্যার এই হাসপাতালে হামের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় চালু করা হয়েছে বিশেষ ‘হাম আইসোলেশন ওয়ার্ড’। কিন্তু ২০ বেডের সেই ওয়ার্ডেই সোমবার (১১ মে) ভর্তি ছিল ৮৭ শিশু। কখনো কখনো রোগীর সংখ্যা ছাড়িয়ে যাচ্ছে ১১০ জনও।

রোগীর চাপ বাড়লেও জনবল সংকট তীব্র। ৮৭ শিশুর বিপরীতে এক শিফটে দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র ১ জন মেডিকেল অফিসার, ২ জন ইন্টার্ন চিকিৎসক ও ৬ জন নার্স। সীমিত জনবল নিয়েই হিমশিম খেতে হচ্ছে চিকিৎসক ও নার্সদের। তবে ক্যামেরার সামনে কথা বলতে রাজি হননি তারা।

এদিকে, হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডের সামনে ভিড় স্বজনদের। তাদের অভিযোগ, অতিরিক্ত রোগীর চাপে ঠিকমতো মিলছে না চিকিৎসাসেবা। প্রয়োজনীয় বেড, ওষুধ ও পর্যাপ্ত নজরদারিরও সংকট রয়েছে।

রোগীর অভিভাবক কামরুল হাসান বলেন, হাসপাতালে রোগীর তুলনায় চিকিৎসক ও নার্সের সংখ্যা অত্যন্ত কম। প্রয়োজনীয় অক্সিজেন ও নেবুলাইজার মেশিনেরও সংকট রয়েছে। বাধ্য হয়ে নিজের সন্তানের চিকিৎসার জন্য তিনি নতুন একটি মেশিন কিনে এনেছেন। তিনি জানান, একবার চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফেরার পরও শিশুর অবস্থার উন্নতি হয়নি। বরং আবারও শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় সাতদিন পর দ্বিতীয়বারের মতো হাসপাতালে ভর্তি করাতে হয়েছে।

হামে আক্রান্ত শিশুর পিতা সুলতান মাহমুদ অভিযোগ করে বলেন, তার সন্তান গত দুই-তিন দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি থাকলেও কাঙ্ক্ষিত সেবা মিলছে না। প্রয়োজনের সময় নার্সদের ডাকলেও সহায়তার বদলে দুর্ব্যবহারের শিকার হতে হচ্ছে। তিনি বলেন, অসুস্থ শিশুদের প্রতি হাসপাতালের সেবায় আন্তরিকতার ঘাটতি রয়েছে, যা অভিভাবকদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তুলছে।

আরেক রোগীর স্বজন কায়সার হামিদ বলেন, হাসপাতালে শয্যা সংকট এতটাই তীব্র যে একটি বেডে দুই থেকে তিনজন শিশুকে রাখতে হচ্ছে। মাত্র ২০টি শয্যার বিপরীতে বর্তমানে শতাধিক রোগী ভর্তি রয়েছে। পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় তার ভাগনিকে মেঝেতে বিছানা পেতে শুইয়ে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তিনি জানান, রোগীর মায়েদের ছাড়া অন্য কাউকে ওয়ার্ডে প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না। ফলে স্বজনরা হাসপাতালের সিঁড়ি ও করিডোরে গাদাগাদি করে বসে থাকছেন, যেন স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে অপেক্ষা করছেন।

তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, সীমিত সক্ষমতার মধ্যেও রোগীদের সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা চলছে।

কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতাল আরএমও শান্তনু ঘোষ বলেন, বর্তমানে হাসপাতালের হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে ৮৭ জন রোগী ভর্তি রয়েছেন। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৩০ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন এবং সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ২৩ জন। তিনি জানান, মাত্র ২০ শয্যার বিপরীতে এত বিপুল সংখ্যক রোগী ভর্তি থাকায় চিকিৎসা সেবা পরিচালনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, আইসোলেশন ওয়ার্ড সচল রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন চিকিৎসকরা। তবে বর্তমানে সেখানে মাত্র পাঁচজন চিকিৎসক দায়িত্ব পালন করছেন। অতিরিক্ত চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া গেলে রোগীদের আরও ভালোভাবে সেবা দেওয়া সম্ভব হবে। সংকটের মধ্যেও ২৪ ঘণ্টা চিকিৎসক ও সিনিয়র কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে চিকিৎসা কার্যক্রম চালু রাখতে তারা সর্বাত্মকভাবে কাজ করছেন বলে জানান তিনি।

আরএমও শান্তনু ঘোষ বলেন, ওয়ার্ডের স্থান সংকুলান না থাকায় অতিরিক্ত বেড স্থাপন সম্ভব হচ্ছে না। তাই বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত বিছানা পেতে এবং অনেক ক্ষেত্রে এক বেডে দুই থেকে তিনজন শিশুকে রেখে চিকিৎসা সেবা চালিয়ে যেতে হচ্ছে।

সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৯ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত কক্সবাজারে হাম ও উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে ১ হাজার ৭৮৮ জন। এর মধ্যে ৪২৪ জনের নমুনা পরীক্ষায় ১১৯ জনের শরীরে হামের সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে। আর গত ৪০ দিনে জেলায় মারা গেছে ১৭ জন।

Related Article