০৮ নভেম্বর ২০২৬
হোম স্বাস্থ্য সারাদেশ জাতীয় রাজনীতি অর্থনীতি ও বাণিজ্য খেলাধুলা বিনোদন আন্তর্জাতিক ধর্ম ও জীবন লাইফ স্টাইল শিক্ষা প্রযুক্তি ও বিজ্ঞান পরিবেশ চাকরি বা ক্যারিয়ার মতামত আইন-আদালত কৃষি ও প্রযুক্তি বিশেষ সংবাদ অপরাধ সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিশ্বকাপ ফুটবল
আন্তর্জাতিক

‘কর্ণাটকের জামাই’, আল–সাইয়েদের জয় কি বদলে দেবে মার্কিন রাজনীতির হিসাব

০৮ নভেম্বর, ২০২৬

মোঃ আশিকুর রহমান,
নিজস্ব প্রতিবেদক

ছবি: যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগানের ডেট্রয়েটে জয়ের ঘোষণা দেওয়ার পর আয়োজিত অনুষ্ঠানের মঞ্চে ওঠেন ডেমোক্রেটিক পার্টির সিনেট প্রার্থী আবদুল আল-সাইয়েদ ও তাঁর স্ত্রী সারা জুকাকু। ৪ নভেম্বর, ২০২৬ছবি: এএফপি

২৩৭ বছরের ইতিহাসে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটের প্রথম মুসলিম সদস্য হয়েছেন আবদুল আল-সাইয়েদ। ভারতের কর্ণাটকে স্ত্রীর স্বজনেরা তাঁকে ডাকছেন ‘কর্ণাটকের জামাই’। নির্বাচনী প্রচারে ইসরায়েলপন্থী গোষ্ঠীগুলোর খরচ করা কোটি কোটি ডলার মোকাবিলা ও নিজের মুসলিম পরিচয় নিয়ে আক্রমণ পেরিয়ে আসা এ জয় মার্কিন রাজনীতিতে সত্যিই কতটা পরিবর্তনের ইঙ্গিত, উঠেছে সেই প্রশ্ন।

যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যার মাত্র ২ দশমিক ৫ শতাংশ মুসলিম। পরিস্থিতি বিবেচনায় ফলাফল তাঁর পক্ষে যাবে, এটা আমরা কখনো ভাবিনি’—কথাগুলো ভারতের কেরলমভিত্তিক ব্যবসায়ী জুকাকু আবদুল মজিদের। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর নির্বাচিত আবদুল আল-সাইয়েদের স্ত্রীর চাচা। নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে তিনি বলেছেন, এ জয় তাঁদের কাছে এক ‘আশীর্বাদ’।

আল-সাইয়েদ মিশিগান থেকে মার্কিন সিনেটের সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। ২৩৭ বছরের ইতিহাসে তিনিই সিনেটের প্রথম মুসলিম সদস্য। ভারতের কর্ণাটক রাজ্যে স্ত্রীর স্বজনেরা তাঁকে ডাকছেন ‘কর্ণাটকের জামাই’। তবে এ জয়ের গল্প শুধু তাঁর শ্বশুরবাড়ির আনন্দের নয়। তাঁকে নিয়ে আলোচনা এখন যুক্তরাষ্ট্রসহ সর্বত্র। কিন্তু কেন?

প্রথম মুসলিম মার্কিন সিনেটর

মধ্যবর্তী নির্বাচনে মিশিগান থেকে সিনেটর নির্বাচিত হয়েছেন বিরোধী ডেমোক্রেটিক পার্টির আবদুল আল-সাইয়েদ। তিনি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী মাইক রজার্সকে হারিয়েছেন। মিডল ইস্ট আই বলছে, ৩ নভেম্বরের ভোটের ফল ৫২ শতাংশ বনাম ৪৬ শতাংশ।

যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটের কার্যক্রম শুরু হয় ১৭৮৯ সালে। এরপর ২৩৭ বছরে কোনো মুসলিম কংগ্রেসের উচ্চকক্ষের সদস্য নির্বাচিত হননি। সেই ধারা ভেঙেছেন আল-সাইয়েদ। অবসরে যাওয়া ডেমোক্রেটিক সিনেটর গ্যারি পিটার্সের ছেড়ে দেওয়া আসনে তিনি জিতেছেন।

নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদে মুসলিম সদস্য অবশ্য আগেও ছিলেন। ২০০৬ সালে কিথ এলিসন প্রথম মুসলিম হিসেবে সেখানে নির্বাচিত হন। ২০১৮ সালে রাশিদা তালিব ও ইলহান ওমর প্রথম মুসলিম নারী হিসেবে কংগ্রেসে আসেন। তবে সিনেটে এত দিন কোনো মুসলিম ছিলেন না।

মিডল ইস্ট আইয়ের তথ্য, আল-সাইয়েদ শুধু সিনেটের প্রথম মুসলিম আমেরিকানই নন, এ কক্ষে আসন পাওয়া ষষ্ঠ আরব আমেরিকানও। এই জয় ডেমোক্র্যাটদের দেশজোড়া বড় সাফল্যের অংশ। মধ্যবর্তী এ নির্বাচনে ‘নীল জোয়ারে’ ডেমোক্র্যাটরা পেয়েছেন কংগ্রেসের দুই কক্ষেরই নিয়ন্ত্রণ।

মিশিগানের আসনটি নিয়ে লড়াই ছিল কঠিন। আল-জাজিরার একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, এ আসনের ফলই ঠিক করতে পারে ট্রাম্পের বাকি মেয়াদে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ কোন দলের হাতে থাকবে। ২০২৪ সালে এই অঙ্গরাজ্যে জিতেছিলেন ট্রাম্প। ভোটের হিসাব-নিকাশে মিশিগান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দোদুল্যমান অঙ্গরাজ্যগুলোর একটি।

‘কর্ণাটকের জামাই’: ভাটকলের আনন্দ

আল-সাইয়েদের স্ত্রী চিকিৎসক সারা জুকাকু মনোরোগবিশেষজ্ঞ। তাঁর শিকড় ভারতের দক্ষিণের রাজ্য কর্ণাটকে। অবশ্য তাঁর জন্ম ও বেড়ে ওঠা মিশিগানে। তাঁর স্বজনেরা এখনো কর্ণাটকের ভাটকল শহরে থাকেন। শহরটি রাজ্যের রাজধানী বেঙ্গালুরু থেকে প্রায় ৪৯০ কিলোমিটার পশ্চিমে।

ইনডিপেনডেন্ট বলেছে, ভারতে সারার পরিবারের সদস্যরা আল-সাইয়েদের জয় উদ্‌যাপন করছেন। তাঁরা তাঁকে বলছেন ‘কর্ণাটকের জামাই’। তাঁদের ভাষ্য, তিনি একজন আন্তরিক ও মিশুক মানুষ।

রাজনৈতিক চাপ ও ভয় দেখানোর কাছে নতি স্বীকার না করাই আল-সাইয়েদকে প্রতিষ্ঠিত রাজনীতিকদের থেকে আলাদা করেছে। দলীয় প্রার্থী বাছাই ও মধ্যবর্তী নির্বাচন থেকে স্পষ্ট, আইপ্যাকের মতো প্রভাবশালী লবিগোষ্ঠীর অর্থ ব্যয়ই নির্বাচনের ফল ঠিক করে দিতে পারে না।

সারা ও আল-সাইয়েদের পরিচয় মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়। ২০০৬ সালে তাঁরা বিয়ে করেন। তাঁদের দুই মেয়ে আছে। ১০ বছরের বেশি আগে এক কাজিনের বিয়েতে তাঁরা ভাটকলে গিয়েছিলেন। সেখানে স্বজনদের সঙ্গে অন্তত চার দিন কাটিয়েছিলেন।

সারার চাচা জুকাকু আবদুল মজিদ বলেন, আল-সাইয়েদের জয় তাঁদের ব্যক্তিগত বিজয়ও। সারার কাজিন বিবি হুসনা এনডিটিভিকে বলেন, কঠিন প্রচার এবং ভোট গণনার দিন পরিবার চাপে ছিল। তাঁর কথায়, ‘আল্লাহর রহমতে সুন্দর এক জয় হয়েছে।’

সারার পারিবারিক ইতিহাসেও আছে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসনের গল্প। তাঁর বাবা জুকাকু তাইয়েব বেঙ্গালুরু মেডিকেল কলেজে পড়েছেন। ১৯৭৬ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে যান। সারার দাদা জুকাকু শামসুদ্দিন তৎকালীন মহীশূর রাজ্যের অর্থবিষয়ক উপমন্ত্রী ছিলেন।

 

‘আরবের চেয়ে বেশি ভারতীয়’: আল-সাইয়েদের রসিকতা

নির্বাচনী প্রচারে তীব্র লড়াইয়ের মধ্যেও আল-সাইয়েদ নিজের ভারতীয় পারিবারিক সম্পর্ক নিয়ে রসিকতা করেছেন। বলেছেন, দুই দশক ধরে এক দক্ষিণ ভারতীয় নারীর সঙ্গে সংসার করে তিনি ‘আরবের চেয়ে বেশি ভারতীয়’ হয়ে গেছেন (সূত্র: ইনডিপেনডেন্ট)। উল্লেখ্য, আল-সাইয়েদ একজন মিসরীয় বংশোদ্ভূত তথা আরব বংশোদ্ভূত আমেরিকান।

আল-সাইয়েদ আরও বলেন, ‘আমি সম্মানসূচক ভারতীয়। ভারতীয় সংস্কৃতির একটা ধৈর্যের দিক আছে। ভারতে না গেলে আমি তা বুঝতে পারতাম না। আপনি এক শ কোটি মানুষের মধ্যে ঘেরা। কোনো কিছুই দ্রুত হয় না।’

মার্কিন সিনেট নির্বাচনে মিশিগানের ডেমোক্রেটিক প্রাইমারিতে জয়ী হয়ে মধ্যবর্তী নির্বাচনেও জিতেছেন আবদুল আল-সাইয়েদ। ডেট্রয়েটে সংবাদ সম্মেলনে। ৫ আগস্ট ২০২৬

মার্কিন সিনেট নির্বাচনে মিশিগানের ডেমোক্রেটিক প্রাইমারিতে জয়ী হয়ে মধ্যবর্তী নির্বাচনেও জিতেছেন আবদুল আল-সাইয়েদ। ডেট্রয়েটে সংবাদ সম্মেলনে। ৫ আগস্ট ২০২৬ছবি: রয়টার্স

আগস্টে প্রকাশিত এক পডকাস্টে আল-সাইয়েদ একটি পারিবারিক রসিকতার কথা বলেন। তাঁর এক চাচা জানতে চেয়েছিলেন, ৮ কোটি মিসরীয় থাকতে তিনি কেন ভারতীয় নারীকে বিয়ে করলেন। আল-সাইয়েদ জবাব দেন, ‘আমু (আরবিতে চাচা), ওদের (ভারতীয়দের) সংখ্যা এক শ কোটি। পরিসংখ্যান অনুযায়ী এটাই ছিল উচ্চ সম্ভাবনার বিষয়।’

আলাদা এক বক্তব্যে আল-সাইয়েদ বলেছেন, তিনি ‘দেশি নারীদের’ মধ্যে ঘেরা। তাঁর ভাষায়, ‘আমার দুই দেশি মেয়ে আর এক দেশি স্ত্রী আছে।’ তবে নিজের মিসরীয় শিকড় থেকেও তিনি দূরে সরে যাননি। তিনি মিসরীয় খাবার ও রসবোধের প্রশংসা করেছেন। তাঁর বাবা বড় হয়েছেন মিসরের ভূমধ্যসাগরীয় শহর আলেকজান্দ্রিয়ায়।

মিশিগানের ছেলে, পেশায় চিকিৎসক

আল-সাইয়েদের জন্ম মিশিগানের রচেস্টার হিলসে। তাঁর মা-বাবা মিসর থেকে এসে যুক্তরাষ্ট্রে বসতি গড়েছিলেন। রাজনীতিতে আসার আগে তিনি চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্য খাতে কাজ করেছেন।

আনাদোলু এজেন্সি বলছে, পড়াশোনায়ও আল-সাইয়েদ উজ্জ্বল। ২০০৭ সালে ইউনিভার্সিটি অব মিশিগান থেকে স্নাতক হন। রোডস স্কলার হিসেবে ২০১১ সালে অক্সফোর্ড থেকে জনস্বাস্থ্যে ডক্টরেট করেন। ২০১৪ সালে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ডিগ্রি পান।

তৃণমূল পর্যায় থেকে আসা এই অর্থ (আল-সাইয়েদের প্রচারে সহায়তা করতে দেওয়া অর্থ) মিশিগানের মানুষের মধ্যে আল-সাইয়েদকে নিয়ে তৈরি হওয়া উদ্দীপনার প্রমাণ। এটি মিশিগান অঙ্গরাজ্যকে বছরের পর বছর পিছিয়ে রাখা পুরোনো ধারার রাজনীতির বিরুদ্ধে মানুষের অবস্থানেরও প্রকাশ।

কোল ওজনিয়াক, আল-সাইয়েদের প্রচারশিবিরের মুখপাত্র

২০১৫ সালে আল-সাইয়েদ ডেট্রয়েট শহরের স্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালক হন। আর্থিক সংকটের পর শহরটির জনস্বাস্থ্যসেবা নতুন করে সাজানোর কাজ তদারক করেন। ২০১৭ সাল পর্যন্ত তিনি এ পদে ছিলেন। ২০১৮ সালে গভর্নর পদে ডেমোক্রেটিক পার্টির মনোনয়ন চেয়েছিলেন, কিন্তু গ্রেচেন হুইটমারের কাছে হেরে যান। ২০২৬ সালে তিনি আবার নির্বাচনী রাজনীতিতে ফেরেন।

বিপুল অর্থ ঢেলেও যায়নি থামানো

গত আগস্টে মিশিগানে ডেমোক্রেটিক পার্টির সিনেট প্রার্থী বাছাইয়ের নির্বাচনে (প্রাইমারি) আল-সাইয়েদ প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য হ্যালি স্টিভেন্সকে হারান। তাঁর (আল-সাইয়েদ) প্রচারে সমর্থন দেন প্রগতিশীল ধারার কয়েকজন প্রভাবশালী রাজনীতিক। এঁদের মধ্যে ছিলেন সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স, প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজ ও রাশিদা তালিব।

আল-জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রার্থী বাছাইয়ের ওই লড়াইয়ে আল-সাইয়েদকে হারাতে ইসরায়েলপন্থী গোষ্ঠীগুলো ৬ কোটি ডলারের বেশি খরচ করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে প্রভাবশালী ইসরায়েলপন্থী লবিং গোষ্ঠী আমেরিকান ইসরায়েল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটি (আইপ্যাক) এ লড়াইয়ে নেতৃত্ব দেয়। তারা স্টিভেন্সের পক্ষে ৩ কোটি ডলারের বেশি ঢালে। কিন্তু মার্কিন গণমাধ্যম এনবিসি আল-সাইয়েদের জয়ের পূর্বাভাস দেয়। এখন তাঁর জয়কে এআইপ্যাকের জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েল লবির বিরুদ্ধে আল-সাইয়েদের অবস্থান এবং তা থেকে তৈরি হওয়া উদ্দীপনা না থাকলে তিনি স্টিভেন্সকে হারাতে পারতেন না।

রাজনৈতিক চাপ ও ভয় দেখানোর কাছে নতি স্বীকার না করাই আল-সাইয়েদকে প্রতিষ্ঠিত রাজনীতিকদের থেকে আলাদা করেছে। প্রাথমিক বাছাই ও মধ্যবর্তী নির্বাচন থেকে এটা স্পষ্ট, আইপ্যাকের মতো প্রভাবশালী লবিগোষ্ঠীর অর্থ ব্যয়ই নির্বাচনের ফল ঠিক করে দিতে পারে না।

Related Article