২৪ নভেম্বর, ২০২৫
মোঃ শাহরিয়ার,
ছবি: দক্ষিণ এশিয়ার বাণিজ্যের ভূরাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু চট্টগ্রাম বন্দর
চট্টগ্রাম বন্দর শুধু একটি বাণিজ্যিক কেন্দ্র নয়—এটি দক্ষিণ এশিয়ার সমগ্র ইতিহাস, রাজনীতি, বিশ্ববাণিজ্য, উপনিবেশ, আধুনিক অর্থনীতি এবং বাংলাদেশের জীবনরেখার অংশ। দেশের মোট জিডিপির এক তৃতীয়াংশ আসে চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে।কর্ণফুলী নদীর তীরে অবস্থিত এই বন্দর ২,০০০ বছরেরও অধিক পুরনো সামুদ্রিক যাত্রাপথের এক কেন্দ্রবিন্দু।
ধারাবাহিক প্রতিবেদনের দ্বিতীয় পর্বঃ এই পর্বে ইউরোপীয়দের আগমন উত্থান-পতন এবং মুঘলদের বিজয় পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দর কেন্দ্রিক চলমান ঘটনা প্রবাহের বিভিন্ন তথ্য রয়েছে।
ইউরোপীয়দের আগমন
পর্তুগিজ যুগ (১৫১৭–১৭শ শতক):
কর্ণফুলীর মোহনায় নতুন ইতিহাস
চট্টগ্রামের হাজার বছরের পুরোনো সামুদ্রিক ঐতিহ্যে প্রথম ইউরোপীয় উপস্থিতি ঘটে ১৫১৭ সালে—পর্তুগিজ নাবিকদের আগমনের মধ্য দিয়ে। এই আগমন শুধু নতুন বাণিজ্যের পথ খুলে দেয়নি, বদলে দিয়েছে বন্দরের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক দৃশ্যপট। মধ্যযুগের সুলতানি ও আরাকান শাসিত চট্টগ্রাম তখন নতুন এক বৈশ্বিক শক্তির সঙ্গে পরিচিত হতে শুরু করে।
১৫১৭ সালে পর্তুগিজ নাবিক João da Silveira-র নেতৃত্বে একটি জাহাজবহর প্রথমবার চট্টগ্রাম উপকূলে নোঙর ফেলে। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল—
মসলার বাণিজ্য
ঘোড়া ও বারুদের বাজার প্রসার
পূর্ব ভারত–দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সমুদ্রপথে কেন্দ্র স্থাপন।
চট্টগ্রামের গভীর নাব্যতা, পাহাড়–নদীর মিলিত ভৌগোলিক সুবিধা ও পূর্ব ভারতের প্রবেশদ্বার হওয়ায় তারা দ্রুত বুঝে যায়—এটি উপনিবেশিক শক্তির জন্য আদর্শ ঘাঁটি।
পর্তুগিজদের স্থায়ী বসতি গড়ে ওঠা (১৫২০–১৫৩০)
কর্ণফুলীর মোহনার দক্ষিণ পাশে পর্তুগিজরা প্রথম তাদের গুদামঘর (Factory House) স্থাপন করে। এর পরপরই তারা—
‘Firingi Bazar’ নামে প্রথম ইউরোপীয় বসতি স্থাপন করে।
‘Bandel Church’ ধাঁচে প্রথম প্রার্থনালয় নির্মাণ করে।
বাণিজ্য নিরাপত্তার জন্য ছোট কাঠের দুর্গ তৈরি করে।
চট্টগ্রাম তখন দক্ষিণ–এশিয়ার পর্তুগিজ নৌ–বাণিজ্যের “পূর্ব কান্ডি” বা gateway হিসেবে গুরুত্ব পায়।
আরাকান ও পর্তুগিজদের রাজনৈতিক জোট-
১৫শ শতকের শেষ দিকে চট্টগ্রাম আরাকান রাজ্যের প্রভাবাধীন হওয়ায় পর্তুগিজরা কৌশলগতভাবে আরাকান রাজার সঙ্গে জোট গড়ে তোলে। ফলে
পর্তুগিজরা বাণিজ্যে একচেটিয়া সুবিধা পায়।
জাহাজ নোঙর, কার্গো লোড–আনলোডে ট্যাক্স ছাড়,
উপকূলে যুদ্ধজাহাজ রাখার অনুমতি,আরাকান রাজ্যের বন্দরে লবণ, চাল, মসলা, মানব শ্রমিক ও হাতির দাঁতের বাণিজ্যে অংশগ্রহণ এই জোট পরবর্তী শতকে পর্তুগিজদের চট্টগ্রামে একটি “নৌ–সামরিক শক্তি” হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
চট্টগ্রামের ‘পাইরেট হেডকোয়ার্টার’ হয়ে ওঠা (১৫৭০–১৬১০)
যদিও পর্তুগিজরা প্রথমে ব্যবসায়ী হিসেবে আসে, পরে তাদের একটি অংশ ফ্রিঙ্গি জলদস্যু বা ‘Firingi Pirates’ নামে কুখ্যাত হয়ে ওঠে।
তারা আরব–বঙ্গ–ত্রিপুরার বাণিজ্য জাহাজে হামলা,নদী পথে অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়,
উপকূলীয় গ্রামের মানুষ ধরে আরাকান বা পর্তুগিজ উপনিবেশে বিক্রি,আরাকান রাজাকে যুদ্ধবন্দী সরবরাহ করতেন।
চট্টগ্রামের নদীপথে ফৌজদারহাট,পতেঙ্গা,ভবানীপুর, বরিশালঘাটে,বর্তমান আগ্রাবাদ এলাকায় তাদের শক্ত ঘাঁটি ছিল—
এই জলদস্যু কার্যক্রম চট্টগ্রামকে একসময় “Pirate Coast of Bengal” নামে কুখ্যাত করে তোলে।
চট্টগ্রাম বন্দরের বাণিজ্যে পর্তুগিজদের বিপ্লব:
দুর্নাম থাকা সত্ত্বেও পর্তুগিজরা চট্টগ্রামে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক পরিবর্তন আনে। তার মধ্যেই
চট্টগ্রাম থেকে উৎকৃষ্ট মানের মসলিন,সিল্ক,হাতির দাঁত,মোম, চামড়া,মসলা ও শুকনো মাছ, সুতি কাপড়, রপ্তানি এবং আফ্রিকান ঘোড়া,পর্তুগিজ লোহার অস্ত্র,গান পাউডার,ইউরোপীয় কাঁচপাত্র,ওয়াইন ও ধাতব জিনিস,পর্তুগিজ নৌ–প্রযুক্তি,আমদানি অন্যতম। পর্তুগিজদের আগমনের ফলে চট্টগ্রাম বন্দর তখন আন্তর্জাতিক রুটে আরও সুপরিচিত হয়ে ওঠে।
চট্টগ্রামে প্রথম ইউরোপীয় চার্চ ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের উত্থান-পতন।
পর্তুগিজরা চট্টগ্রামে বেশকিছু ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে।
প্রথম চ্যাপেল/চার্চ,
ইউরোপীয় ধাঁচে স্কুল
স্থানীয়দের মধ্যে ক্যাথলিক ধর্ম প্রচার
স্থানীয় মহিলা–পুরুষের সঙ্গে বিবাহ, ফলে “Firingi Community” সৃষ্টি অন্যতম।
এই সম্প্রদায়ের নামই পরবর্তীতে ফেনী, চট্টগ্রাম ও নোয়াখালির বিভিন্ন স্থানে “ফরাইঙ্গি পাড়া” নামের উৎপত্তি।
জলদস্যুতা বনাম বাণিজ্য: অশান্ত সময় (১৬১০–১৬৬৬)
এই সময় পর্তুগিজদের দুটি রূপই দেখা যায়—
১) বণিক পর্তুগিজ যারা-
রাজস্ব প্রদান করে নৌ–বাণিজ্য করত।
কাস্টমস ও ঘাটশুল্ক দিত।
গুদাম, জাহাজ নির্মাণ কেন্দ্র তৈরি করত।
২) জলদস্যু পর্তুগিজ (Firingi Pirates)
আরাকান রাজার সঙ্গে যৌথ হামলা করত।
গোপন দাস ব্যবসা করত।
বাঙালি উপকূলে ভয় সৃষ্টি করত।
চট্টগ্রামের ইতিহাসে এই যুগকে সবচেয়ে রোমাঞ্চকর, আবার সবচেয়ে উত্তাল সময় বলে ধরা হয়।
পর্তুগিজ যুগের পতন—মুঘল বিজয় (১৬৬৬)
১৬৬৬ সালে মুঘল সুবাদার শায়েস্তা খান সমুদ্র–স্থল–নদী তিন দিক থেকে চট্টগ্রাম দখল করেন।
এ অভিযানে জলদস্যু পর্তুগিজদের ঘাঁটি ধ্বংস হয়।
বন্দরে মুঘল প্রশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়
পর্তুগিজদের অধিকাংশ আরাকানে পালিয়ে যায়।
এ ঘটনার মধ্য দিয়ে চট্টগ্রামে পর্তুগিজ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে এবং শুরু হয় মুঘল আমলের স্থিতিশীল বন্দর যুগ।
চট্টগ্রামে পর্তুগিজদের প্রভাব—যা আজও রয়ে গেছে
“ফিরিঙ্গি বাজার”, “ফরাইঙ্গি পাড়া”—এই সব নামকরণ
স্থানীয় বাংলায় কিছু পর্তুগিজ শব্দ: আলপিন, চাবুক, টেবিল, চাবি ইত্যাদি
ইউরোপীয় নৌ–প্রযুক্তির প্রথম আগমন
বন্দর–ভিত্তিক বণিক সম্প্রদায়ের উত্থান
পূর্ব–পশ্চিম বাণিজ্যের নতুন সংযোগ
পর্তুগিজ যুগ শুধু চট্টগ্রামই নয়, সমগ্র উপকূলীয় বাংলার বাণিজ্য সংস্কৃতিতে গভীর ছাপ ফেলে যায়।