১৪ Jul, ২০২৬
Md Ashikur Rahman,
ছবি: জাতীয় সংসদ |ফাইল ছবি
সংবিধান সংশোধনে জাতীয় সংসদে বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। সোমবার (১৩ জুলাই) রাতে চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি ১৭ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠনের প্রস্তাব করেন। কিন্তু ‘সংবিধান সংশোধন পরিষদ’ গঠনের দাবির পাশাপাশি বিরোধীদল এই কমিটিতে অংশ না নেয়ার ঘোষণা দিয়ে ওয়াক আউট করে। পরে ১২ সদস্যদের কমিটি গঠন করা হয়। একইসাথে বিরোধীদলের পক্ষ থেকে পরবর্তী সময়ে কমিটিতে যুক্ত হওয়ার জন্য নাম দেয়া দেয়া হলে তাদের যুক্ত করে নেয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশেষ কমিটির সদস্য হলেন- কমিটির সভাপতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, সদস্য- চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি, আইনমন্ত্রী মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান, জয়নাল আবেদিন, মোহাম্মদ জুনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, আন্দালিভ রহমান পার্থ, মোহাম্মদ নুরুল হক, মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, ফারজানা শারমিন, সাকিলা ফারজানা, মোহাম্মদ মাহমুদুল হক রুবেল ও মোহাম্মদ অলিউল্লাহ।
এদিকে, কমিটি গঠনের প্রস্তাবের পর ফ্লোর নিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান বলেন, ‘এই কমিটি গঠনের প্রস্তাবটি প্রথম অধিবেশনেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী উত্থাপন করেছিলেন। সেদিনই বিরোধীদল তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। এরপর কয়েক দফায় আমাদের সাথে যোগাযোগ করেছেন, বৈঠক করেছেন। তবে বিরোধীদল কখনোই এই কমিটির জন্য কোনো সদস্যের নাম দেবে বলে জানায়নি, কারণ তারা নীতিগতভাবে এই প্রস্তাবকে গ্রহণ করেনি।’
তিনি বলেন, “আমরা জনগণের কাছে ও জাতির কাছে ওয়াদাবদ্ধ, যেমনটি বর্তমান সরকারি দলও নির্বাচনের আগে ওয়াদাবদ্ধ ছিল। নির্বাচনের পূর্বে সব দলই গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বলার আহ্বান জানিয়েছিল। প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে ‘হ্যাঁ’ ভোট বিজয়ী হলে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করা হবে। এরই প্রেক্ষিতে আমরা দুটি শপথ নিয়েছি— একটি সংসদ সদস্য হিসেবে এবং অন্যটি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে। বিরোধীদল মনে করে দুটি শপথই বহাল ও কার্যকর আছে। সুতরাং, সেই সংস্কার পরিষদকে এড়িয়ে যাওয়ার জন্য যদি এই সংসদীয় কমিটি গঠন করা হয়, তবে আমরা এই প্রস্তাব সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করছি।”
বিরোধীদলীয় নেতা আরো বলেন, ‘আমরা আগের অবস্থানেই অনড়। গণতন্ত্রের মূল দাবি হচ্ছে জনগণের মতামতকে মেনে নেয়া, যা এক্ষেত্রে প্রায় ৭০ শতাংশের কাছাকাছি অর্থাৎ ৬৮ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষের রায়। এই বিপুল জনমতকে যদি অবলীলায় শেষ করে দেয়া হয়, তবে ভবিষ্যতে দেশের মানুষ গণতান্ত্রিক পদ্ধতির ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলবে এবং বিদ্রোহী হয়ে উঠবে।’
‘জনগণের এই অভিপ্রায় ও মতামতকে কোনোভাবেই অগ্রাহ্য বা অপমান করা উচিত হবে না। জনগণের রায়কে সম্মান না জানানোর প্রতিবাদে তারা শুধু এই কমিটিতে অংশগ্রহণ থেকেই বিরত থাকবো না, বরং সংসদ থেকে ওয়াক আউট করছি,’ বলেন তিনি।
এরপরই বিরোধীদলের সদস্যরা অধিবেশন কক্ষ ত্যাগ করেন।
এসময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্পিকারের অনুমতি নিয়ে বলেন, ‘বিরোধীদলীয় নেতা যে পয়েন্টে ওয়াক আউট করছেন তা তাদের বিবেচনায় সঠিক হতে পারে, তবে গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের মানুষের মূল প্রত্যাশা হলো পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল করা। যদি পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল করা না হয়, তবে হাইকোর্ট বা সুপ্রিম কোর্ট রায় দিলেও দেশকে ওই বিতর্কিত সংশোধনীর ওপর ভিত্তি করেই চলতে হবে। সুতরাং, সংবিধান সংশোধনী কমিটি গঠন করা এবং সংবিধান সংশোধন করা ছাড়া এই জাতিকে নতুন প্রত্যাশা অনুযায়ী এগিয়ে নেয়া সম্ভব নয়।’
বিরোধীদলীয় নেতার দুটি শপথের দাবির প্রেক্ষিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘দুটি শপথ নিলে প্রথম শপথটিই তো অবৈধ হয়ে যায়। কারণ বর্তমান সংবিধান অনুসারেই দেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, মহামান্য রাষ্ট্রপতি জাতীয় সংসদের অধিবেশন আহ্বান করেছেন এবং সেই সংবিধান অনুযায়ী সংসদে মহামান্য রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর সরকারি ও বিরোধী- উভয় দল আলোচনা করেছে। সাংবিধানিক নিয়ম ও ধারাবাহিকতা অনুসারেই সংসদের প্রত্যেকটি অধিবেশন ও বৈঠক পরিচালিত হচ্ছে।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রশ্ন তোলেন, সংবিধানে কোথায় আছে যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে আলাদা শপথ নেয়া যাবে? তিনি একে সম্পূর্ণ অসাংবিধানিক আখ্যা দিয়ে বলেন, এটি উপদেষ্টা পরিষদের সিদ্ধান্তে আইনি উপদেষ্টার নথিতে পাস করে নির্বাচন কমিশনে পাঠানো হয়েছিল, যা প্রথম দিন থেকেই অবৈধ। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৪৮ এবং তৃতীয় তফসিল লঙ্ঘন করে ব্লু পেপারে সংসদ সদস্যদের জন্য আরেকটি শপথের যে ফর্ম ছাপানো হয়েছিল, তা সম্পূর্ণ ‘নাল অ্যান্ড ভয়েড’ বা বাতিল এবং এর কোনো সাংবিধানিক ভিত্তি নেই।
গণভোট প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “গণভোটের যে আদেশ, যেটিকে ‘জুলাই আদেশ’ বা ‘জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন সংস্কার আদেশ’ নাম দেয়া হয়েছে, সেটি প্রথম দিন থেকেই এখতিয়ারবহির্ভূত, ফ্রড অন কনস্টিটিউশন এবং কালারেবল লেজিসলেশন ছিল, যা রাষ্ট্রপতি করতে পারেন না। রাজনৈতিক সমঝোতার জুলাই সনদের কোথাও এমন কিছু ছিল না যেখানে উভয় পক্ষ স্বাক্ষর করেছে।”
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘জুলাই জাতীয় সনদে যে সমঝোতা হয়েছে তার চার ভাগের সাড়ে তিন ভাগ তারা মানেন, কিন্তু বাকি আধাখানি অংশ সংবিধানের ওপর অবৈধ হাত বাড়িয়েছে।’
বিরোধীদলকে সংসদে এসে আলোচনা করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘অন্যথায় রাস্তায় গিয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদের কমিটি করলে সংবিধান সংশোধন না করে তারা বসে থাকতে পারবেন না। আর সংবিধান সংশোধন না করলে জাতিকে শেখ হাসিনার দেয়া পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়েই চলতে হবে, যা কেউ চায় না।’
অবিলম্বে এই সংবিধান সংশোধনী কমিটি কাজ শুরু করবে জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘তারা দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান, জুডিশিয়ারি, আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন, ডিজিটাল ও প্রিন্ট মিডিয়ার সম্পাদক, বুদ্ধিজীবী, সংবিধান বিশেষজ্ঞ এবং জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষরকারী সকল রাজনৈতিক দলের সাথে সংসদ ও সংসদের বাইরে বিস্তারিত আলোচনা করবেন। এরপর সমস্ত অংশীজনের সুপারিশের ভিত্তিতে সংসদে ১৮তম সংবিধান সংশোধনী বিল উত্থাপন করা হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন যে, বিরোধীদলীয় সদস্যগণ ইমোশনাল বা আবেগসর্বস্ব রাজনীতি পরিহার করে একটি শক্তিশালী সংবিধান সংশোধনী বিল আনার স্বার্থে সরকারকে সহযোগিতা করবেন।’
এরপর ১২ সদস্যেন কমিটি গঠন করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, এর আগেও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন প্রসঙ্গ নিযে সংসদে আলোচনা ও ওয়াক আউটের ঘটনা ঘটেছে।