০৫ অগাস্ট, ২০২৫
মোঃ রুবেল আহমেদ,
ছবি: হৃদয়ের ছবি হাতে মা রেহানা বেগম ও বোন জেসমিন আক্তার
মায়ের চোখ আজও পথ চেয়ে থাকে! হয়তো ফিরবে হৃদয়, হয়তো আবার একবার “মা” বলে ডাকবে।
গত বছরের ৫ আগস্ট। দেশে গণঅভ্যুত্থান, সরকারের পতন, রাজপথে বিজয়ের উল্লাস। হৃদয়ের পরিবারের দাবি, সেদিন বিকেলে গোপালপুর উপজেলার আলমনগরের কলেজছাত্র হৃদয়কে গাজীপুরের কোনাবাড়ীতে শরিফ মেডিক্যাল হাসপাতালের সামনে বিজয় মিছিল থেকে ১০-১২ জন পুলিশ সদস্য ঘিরে ধরে, বন্দুক ঠেকিয়ে গুলি চালায়। মাটিতে লুটিয়ে পড়া রক্তমাখা নিথর দেহটি চ্যাংদোলা করে টেনে নিয়ে যায় পুলিশ। সেদিনের সেই নির্মম ঘটনার ভিডিও মুহূর্তেই ভাইরাল হয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে—নাড়িয়ে দেয় হাজারো মানুষের হৃদয়।
হৃদয় ছিল হেমনগর ডিগ্রি কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্র। পরিবারের একমাত্র সন্তান। লেখাপড়ার খরচ চালাতে গাজীপুরে অটোরিকশা চালাত সে। ৫ আগস্ট বিকাল থেকে আর খোঁজ পাওয়া যায়নি তার।
তার মা রেহেনা বেগম আজও অপেক্ষায়—হয়তো ফিরে আসবে বলে। অন্তত হাড়গোড়ের খোঁজ পেলেও বাড়ির উঠোনে সমাধিস্থ করতে চান দিনমজুর বাবা লাল মিয়া। বৃদ্ধ বাবা ভ্যান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করলেও শোকে আর ঠিকমতো কাজ করতে পারেন না। এনজিওর ঋণ পরিশোধ না করতে পেরে আরও সংকটে পড়েছে পরিবারটি।
এই ঘটনায় হৃদয়ের ভগ্নিপতি মো. ইব্রাহীম বাদী হয়ে কোনাবাড়ী থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
মামলার বাদী মো. ইব্রাহীম বলেন, “গত বছরের ৫ আগস্ট সকাল থেকেই আমি ও হৃদয় আন্দোলনে অংশ নেই। শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পর আমরা সকলের সাথে আনন্দ মিছিলে যাই। মিছিলটি কোনাবাড়ী থানার কাছে পৌঁছালে থানার ভেতর থেকে পুলিশ গুলি ছোড়ে। এক পর্যায়ে শরিফ মেডিক্যালের সামনে পুলিশের ১০-১২ জনের একটি টিম হৃদয়কে ঘিরে ধরে, বন্দুক ঠেকিয়ে গুলি করে। পরে পুলিশ লাশ গুম করার উদ্দেশ্যে টেনে নিয়ে গিয়ে কোনাবাড়ী থানার সামনে বেঞ্চের আড়ালে লুকিয়ে রাখে।”
তিনি আরও জানান, “এ সংক্রান্ত একাধিক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এক বছর পর সরকার নিহতের লাশ উদ্ধারের জন্য তুরাগ নদীতে কাজ করেছে। যদি আমার ভাইয়ের একটি হাড়ও পাই, সেটি নিয়ে পরিবারের সবাইকে সান্ত্বনা দিতে পারবো। বাড়ির পাশে একটি কবর দিতে পারবো।”
নিহত হৃদয়ের বড় বোন জেসমিন আক্তার বলেন, “অভাবের সংসারে হৃদয় কষ্ট করে লেখাপড়া করতো। হৃদয়ের লাশ পাওয়া যায়নি বলে আমার ভাই শহিদের মর্যাদা পায়নি। সরকারের পক্ষ থেকেও কোনো সহযোগিতা পাইনি।”
হৃদয়ের মা–বাবা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমরা শুধু আমাদের ছেলের হাড়গোড় ফেরত চাই। আর যারা এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, তাদের ফাঁসি চাই।
হৃদয়ের লাশের সন্ধানে তুরাগ নদীতে ডুবুরি দল
কলেজছাত্র হৃদয়কে গুলি করে হত্যার ঘটনায় তার মরদেহ উদ্ধারে গত বৃহস্পতিবার গাজীপুর মহানগরীর কড্ডা ব্রিজ এলাকায় তুরাগ নদীতে তিন কিলোমিটারজুড়ে উদ্ধার অভিযান চালায় ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল। অভিযান চলাকালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত কমিটির পরিদর্শক মাসুদ পারভেজসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন এবং উদ্ধার কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন।
এ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গাজীপুর মেট্রোপলিটন গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) উত্তরের ওসি মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, “এই মামলায় এখন পর্যন্ত ১১ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। যেই ব্যক্তিগত গাড়িটি ব্যবহার করে হৃদয়ের লাশ তুরাগ নদীতে ফেলা হয়েছে, সেই গাড়ির চালক রহিম (২৭) আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। এরই অংশ হিসেবে বৃহস্পতিবার তুরাগ নদীতে অভিযান চালানো হয়। আশা করছি খুব শিগগিরই হৃদয়ের মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হবে।”