০৫ নভেম্বর ২০২৬
হোম স্বাস্থ্য সারাদেশ জাতীয় রাজনীতি অর্থনীতি ও বাণিজ্য খেলাধুলা বিনোদন আন্তর্জাতিক ধর্ম ও জীবন লাইফ স্টাইল শিক্ষা প্রযুক্তি ও বিজ্ঞান পরিবেশ চাকরি বা ক্যারিয়ার মতামত আইন-আদালত কৃষি ও প্রযুক্তি বিশেষ সংবাদ অপরাধ সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিশ্বকাপ ফুটবল
ধর্ম ও জীবন

গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যা মানবসভ্যতার ইতিহাসে এক নির্মম অধ্যায়, বিশ্ববিবেকের সামনে বড় প্রশ্ন

০৫ নভেম্বর, ২০২৬

সাইফুর রহমান বাদল,
হরিণাকুণ্ডু উপজেলা (ঝিনাইদহ) প্রতিনিধি

ছবি: সংগৃহিত

 

পৃথিবীর ইতিহাসে যুদ্ধ হয়েছে অসংখ্যবার। সাম্রাজ্য বিস্তারের জন্য যুদ্ধ হয়েছে, ভূখণ্ড দখলের জন্য যুদ্ধ হয়েছে, রাজনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্যও যুদ্ধ হয়েছে। কিন্তু আধুনিক সভ্যতার এই যুগে একটি ভূখণ্ডের কোটি মানুষের জীবন যখন যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি, ক্ষুধা, চিকিৎসাহীনতা ও ধ্বংসস্তূপের মধ্যে আটকে পড়ে, তখন প্রশ্ন ওঠে—মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক আইন এবং জাতিসংঘের অস্তিত্ব আসলে কতটা কার্যকর?
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান সেই প্রশ্নকেই সামনে নিয়ে এসেছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া সংঘাত ক্রমে এমন এক মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিয়েছে, যার ভয়াবহতা বিশ্ববাসীকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করেছে।
গাজার হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ, আবাসিক ভবন ও অবকাঠামোর ব্যাপক ধ্বংস, নারী-শিশুসহ বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি এবং খাদ্য ও চিকিৎসাসংকট আন্তর্জাতিক মানবাধিকার পরিস্থিতিকে এক ভয়াবহ অবস্থায় নিয়ে গেছে।
জাতিসংঘের তদন্তে গণহত্যার অভিযোগ
গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের সবচেয়ে গুরুতর আইনি মূল্যায়ন এসেছে জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের কাছ থেকে।
২০২৫ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশন প্রকাশিত প্রতিবেদনে সিদ্ধান্ত দেয়, গাজায় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েল গণহত্যা সংঘটিত করেছে। কমিশন গণহত্যা সনদের পাঁচটি নির্ধারিত অপরাধের মধ্যে চারটির প্রমাণ পেয়েছে বলে জানায়।
অপরাধগুলো হলো—
১. কোনো জনগোষ্ঠীর সদস্যদের হত্যা করা।
২. জনগোষ্ঠীর সদস্যদের গুরুতর শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি করা।
৩. এমন জীবনযাত্রার পরিবেশ সৃষ্টি করা, যা জনগোষ্ঠীটির সম্পূর্ণ বা আংশিক ধ্বংস ডেকে আনতে পারে।
৪. জনগোষ্ঠীর মধ্যে জন্ম প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
কমিশন আরও জানায়, ইসরায়েলি রাজনৈতিক ও সামরিক কর্মকর্তাদের বক্তব্য এবং সামরিক কার্যক্রমের ধরন থেকে ফিলিস্তিনিদের একটি জনগোষ্ঠী হিসেবে ধ্বংস করার অভিপ্রায়ের প্রমাণ পাওয়া যায়।
সূত্র: জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশন, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫।
২০২৬ সালেও থামেনি আন্তর্জাতিক উদ্বেগ
২০২৬ সালের ২৬ অক্টোবর জাতিসংঘের তদন্ত কমিশন নতুন প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে বলা হয়, গাজায় গণহত্যা অব্যাহত থাকার পাশাপাশি অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০২৫ সালের অক্টোবরের যুদ্ধবিরতির পরও গাজায় ইসরায়েলি হামলা, গোলাবর্ষণ ও গুলিবর্ষণের ঘটনা অব্যাহত ছিল।
জাতিসংঘের এই প্রতিবেদন প্রমাণ করে, গাজার মানবিক সংকট কেবল অতীতের কোনো ঘটনা নয়; এটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে চলমান একটি গুরুতর উদ্বেগের বিষয়।
সূত্র: UN Independent International Commission of Inquiry, ২৬ অক্টোবর ২০২৬।
আন্তর্জাতিক আদালতের অবস্থান কী?
দক্ষিণ আফ্রিকা ২০২৩ সালের ২৯ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (ICJ) ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গণহত্যা সনদ লঙ্ঘনের অভিযোগে মামলা দায়ের করে।
২০২৪ সালের ২৬ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক বিচার আদালত গাজায় ফিলিস্তিনিদের গণহত্যার বিরুদ্ধে সুরক্ষার অধিকারকে বাস্তব ও আসন্ন অপূরণীয় ক্ষতির ঝুঁকিতে রয়েছে বলে উল্লেখ করে।
আদালত ইসরায়েলকে গণহত্যা সনদের আওতাভুক্ত কর্মকাণ্ড প্রতিরোধ, মানবিক সহায়তা নিশ্চিত এবং প্রমাণ সংরক্ষণের জন্য অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয়।
পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ২৮ মার্চ এবং ২৪ মে আদালত অতিরিক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয়। ২৪ মে আদালত রাফাহ অঞ্চলে এমন সামরিক অভিযান বন্ধের নির্দেশ দেয়, যা গাজার ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীর শারীরিক ধ্বংস ডেকে আনতে পারে।
তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—ICJ-এর অন্তর্বর্তী আদেশ চূড়ান্ত রায় নয়। দক্ষিণ আফ্রিকা বনাম ইসরায়েল মামলার চূড়ান্ত বিচারিক নিষ্পত্তি এখনো হয়নি। ২০২৬ সালের ২১ মে আদালত পরবর্তী লিখিত বক্তব্য দাখিলের সময়সীমা নির্ধারণ করেছে।
শিশুদের জন্য পৃথিবী কি নিরাপদ?
গাজার সবচেয়ে মর্মান্তিক বাস্তবতা হলো শিশুদের বিপন্ন জীবন।
যে বয়সে একটি শিশুর হাতে থাকার কথা বই, খেলনা ও বিদ্যালয়ের ব্যাগ, সেই বয়সে তাদের অনেককে বেঁচে থাকার জন্য খাবার, পানি ও নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধান করতে হচ্ছে।
অনেক শিশু বাবা-মাকে হারিয়েছে। অনেক শিশু স্থায়ীভাবে আহত হয়েছে। হাসপাতাল ও চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর চাপ, ওষুধের সংকট এবং নিরাপদ পানির অভাব তাদের জীবনকে আরও বিপন্ন করেছে।
যুদ্ধের কোনো পক্ষের সামরিক লক্ষ্য অর্জনের নামে বেসামরিক জনগণের জীবন ও নিরাপত্তাকে উপেক্ষা করা যায় না। আন্তর্জাতিক মানবিক আইন অনুযায়ী বেসামরিক মানুষ, বিশেষ করে শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা সব পক্ষের দায়িত্ব।
আন্তর্জাতিক আইনের চোখে গণহত্যা কী?
১৯৪৮ সালের গণহত্যা সনদ অনুযায়ী, কোনো জাতীয়, নৃতাত্ত্বিক, জাতিগত বা ধর্মীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধ্বংস করার বিশেষ অভিপ্রায়ে নির্দিষ্ট অপরাধ সংঘটিত হলে তা গণহত্যা হিসেবে বিবেচিত হয়।
অর্থাৎ শুধু বিপুলসংখ্যক মানুষ হত্যা করলেই আইনি অর্থে গণহত্যা প্রমাণিত হয় না। হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি অপরাধের উদ্দেশ্য বা বিশেষ অভিপ্রায়ও প্রতিষ্ঠিত হতে হয়।
জাতিসংঘের স্বাধীন তদন্ত কমিশন গাজার ক্ষেত্রে সেই আইনি মানদণ্ড প্রয়োগ করে গণহত্যার সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে। অন্যদিকে ইসরায়েল এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে এবং তাদের সামরিক অভিযানকে হামাসের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষামূলক যুদ্ধ হিসেবে বর্ণনা করে।
তবে আত্মরক্ষার অধিকার থাকলেও আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের বিধান লঙ্ঘনের অধিকার কোনো রাষ্ট্রের নেই।
বিশ্বশক্তির নীরবতা ও দ্বৈতনীতি
গাজার পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটি কঠিন বাস্তবতা প্রকাশ করেছে। একদিকে বিশ্বনেতারা মানবাধিকার, গণতন্ত্র ও আন্তর্জাতিক আইনের কথা বলেন, অন্যদিকে গাজার মতো ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বিশেষ করে প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোর কূটনৈতিক অবস্থান, অস্ত্র সরবরাহ এবং জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের জটিলতা আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের কার্যকারিতা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।
প্রশ্ন হলো, আন্তর্জাতিক আইন কি শুধু দুর্বল রাষ্ট্রের জন্য, নাকি শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোকেও একই আইনের আওতায় আসতে হবে?
মুসলিম বিশ্বের দায়িত্ব কোথায়?
ফিলিস্তিনের সংকট শুধু একটি ভূখণ্ডের রাজনৈতিক সংকট নয়; এটি মানবিক ও আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন।
মুসলিম বিশ্বের রাষ্ট্রগুলোর দায়িত্ব হলো কূটনৈতিক ঐক্য গড়ে তোলা, মানবিক সহায়তা বৃদ্ধি করা, আন্তর্জাতিক আদালত ও জাতিসংঘের মাধ্যমে ন্যায়বিচারের দাবি জোরালো করা এবং ফিলিস্তিনি জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কার্যকর ভূমিকা রাখা।
একই সঙ্গে বেসামরিক মানুষের ওপর যেকোনো পক্ষের হামলা, জিম্মি করে রাখা এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট অবস্থান নেওয়া প্রয়োজন।
ইতিহাসের কাছে দায়বদ্ধ থাকবে বিশ্ববিবেকঃ
গাজা আজ মানবসভ্যতার সামনে এক কঠিন প্রশ্ন দাঁড় করিয়েছে। একটি জনগোষ্ঠীর ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়ে গেলে, হাসপাতাল বিপর্যস্ত হলে, শিশুরা অনাহারে থাকলে এবং সাধারণ মানুষ নিরাপদ আশ্রয় হারালে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কত দিন শুধু বিবৃতি দিয়ে দায়িত্ব শেষ করবে?
জাতিসংঘের তদন্ত কমিশন যখন গাজায় গণহত্যার সিদ্ধান্ত প্রকাশ করেছে, তখন বিষয়টি আর কেবল রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি আন্তর্জাতিক আইন ও জবাবদিহির গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
গণহত্যার অভিযোগের চূড়ান্ত বিচারিক নিষ্পত্তি আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে হওয়া প্রয়োজন। অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি যে রাষ্ট্রেরই হোক, তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে।
গাজার মানুষ কোনো পরিসংখ্যান নয়। তারা মানুষ, তাদেরও বেঁচে থাকার অধিকার আছে। তাদের শিশুদেরও নিরাপদ শৈশব পাওয়ার অধিকার আছে।
ইতিহাস একদিন অবশ্যই প্রশ্ন করবে—যখন গাজার আকাশে বোমা পড়ছিল, যখন শিশুরা ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ছিল, যখন মানুষ খাবার ও পানির জন্য অপেক্ষা করছিল, তখন বিশ্ববিবেক কোথায় ছিল?
গুরুত্বপূর্ণ তথ্যসূত্র ও পত্রিকার রেফারেন্স
১. জাতিসংঘের গণহত্যা-সংক্রান্ত তদন্ত প্রতিবেদন, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫:
জাতিসংঘের তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদন⁠
২. জাতিসংঘের সর্বশেষ তদন্ত প্রতিবেদন, ২৬ অক্টোবর ২০২৬:
জাতিসংঘের ২৬ অক্টোবর ২০২৬-এর প্রতিবেদন⁠
৩. আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (ICJ), দক্ষিণ আফ্রিকা বনাম ইসরায়েল মামলা:
ICJ মামলার নথি ও সর্বশেষ অগ্রগতি⁠
৪. আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের ২৪ মে ২০২৪-এর আদেশ:
ICJ-এর রাফাহ-সংক্রান্ত আদেশ⁠
সম্পাদনাগত মন্তব্য: জাতিসংঘের তদন্ত কমিশন গণহত্যা সংঘটিত হওয়ার সিদ্ধান্ত দিয়েছে। তবে ICJ-তে রাষ্ট্রীয় দায় নির্ধারণের চূড়ান্ত রায় এখনো হয়নি। 
লেখক - সাইফুর রহমান বাদল 
কলামিস্ট ও সাংবাদিক। 
 

Related Article
comment
Poran Hasan
25-Mar-23 | 10:03

ধন্যবাদ 🌸💚

মোঃ মনির হোসেন বকাউল
28-Sep-23 | 10:09

Good news