২৮ অগাস্ট ২০২৬
হোম স্বাস্থ্য সারাদেশ জাতীয় রাজনীতি অর্থনীতি ও বাণিজ্য খেলাধুলা বিনোদন আন্তর্জাতিক ধর্ম ও জীবন লাইফ স্টাইল শিক্ষা প্রযুক্তি ও বিজ্ঞান পরিবেশ চাকরি বা ক্যারিয়ার মতামত আইন-আদালত কৃষি ও প্রযুক্তি বিশেষ সংবাদ অপরাধ সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিশ্বকাপ ফুটবল
ধর্ম ও জীবন / সারাদেশ

বিশ্ব নবী সঃ এর আগমনের আগে আরবের পরিবেশ কেমন ছিল

২৭ অগাস্ট, ২০২৬

সাইফুর রহমান বাদল,
হরিণাকুণ্ডু উপজেলা (ঝিনাইদহ) প্রতিনিধি

ছবি: ইনসাইটে লেখকের ছবি


বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ ﷺ-এর আগমনের আগে আরব ও বিশ্বের সামগ্রিক পরিবেশ বুঝতে হলে ধর্মীয়, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নৈতিক—সব দিক একসঙ্গে দেখতে হয়। ইসলামী ইতিহাসে এই সময়কে সাধারণভাবে জাহেলিয়াতের যুগ (আইয়ামে জাহেলিয়াত) বলা হয়।
 

১. ‘জাহেলিয়াত’ বলতে কী বোঝায়?
‘জাহেলিয়াত’ অর্থ শুধু অশিক্ষা বা লেখাপড়া না জানা নয়। ইসলামী পরিভাষায় এটি এমন একটি জীবনব্যবস্থাকে বোঝায় যেখানে আল্লাহর হিদায়াতের পরিবর্তে কুসংস্কার, শিরক, অন্যায়, গোত্রীয় অহংকার ও নৈতিক অবক্ষয় প্রাধান্য পায়।
তবে মনে রাখতে হবে, সেই সময়ের আরবরা সবাই অশিক্ষিত বা সব দিক থেকে বর্বর ছিল—এ কথা সঠিক নয়। তারা কবিতা, বংশপরিচয়, ব্যবসা, যুদ্ধকৌশল ও ভাষাজ্ঞানে অনেক উন্নত ছিল। মূল সংকট ছিল আকিদা ও নৈতিক নেতৃত্বের।
 

২. ধর্মীয় পরিবেশ
মক্কার প্রধান ধর্মীয় অবস্থা
হযরত ইবরাহিম (আ.) ও ইসমাইল (আ.)-এর সময় কাবা ছিল এক আল্লাহর ইবাদতের কেন্দ্র। কিন্তু শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তাওহিদের পরিবর্তে শিরক প্রবেশ করে।
 

কাবার চারপাশে বহু মূর্তি স্থাপন করা হয়েছিল। কুরাইশ ও অন্যান্য আরব গোত্র বিভিন্ন দেবদেবীর উপাসনা করত।
প্রসিদ্ধ কিছু মূর্তি ছিল—
হুবাল
লাত
উজ্জা
মানাত
কুরআনে লাত, উজ্জা ও মানাতের নাম উল্লেখ করা হয়েছে (সূরা আন-নাজম ৫৩:১৯–২০)।
তারা আল্লাহকে একেবারে অস্বীকার করত—এমন নয়। বরং অনেকেই আল্লাহকে সৃষ্টিকর্তা হিসেবে মানত, কিন্তু তাঁর সঙ্গে অন্য উপাস্যকে শরিক করত।
কুরআন বলছে:
“তুমি যদি তাদের জিজ্ঞেস করো, কে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন? তারা অবশ্যই বলবে, আল্লাহ।”
—সূরা লুকমান ৩১:২৫
অর্থাৎ সমস্যা ছিল তাওহিদের পরিবর্তে শিরক।
 

৩. কাবা ও হজের অবস্থা
কাবা মূলত তাওহিদের কেন্দ্র হলেও জাহেলি যুগে এর চারপাশে মূর্তি স্থাপন করা হয়।
মানুষ হজ করত, কিন্তু ইবরাহিম (আ.)-এর বিশুদ্ধ তাওহিদী শিক্ষা অনেকটাই বিকৃত হয়ে গিয়েছিল।
কুরআনে তাদের কিছু বিকৃত ইবাদত-পদ্ধতির কথাও এসেছে।
তারা কাবাকে কেন্দ্র করে নানা ধরনের প্রথা পালন করত, যার অনেকগুলো ইসলামী শরিয়তের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না।
 

৪. সামাজিক অবস্থা
আরব সমাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল গোত্রভিত্তিক সমাজব্যবস্থা।
মানুষের পরিচয় ছিল—
আমি অমুক গোত্রের মানুষ।
গোত্রের সম্মান রক্ষার জন্য অন্যায় পক্ষেও দাঁড়ানো হতো।
একটি গোত্রের একজনকে অন্য গোত্রের কেউ হত্যা করলে প্রতিশোধ হিসেবে অন্যজনকে হত্যা করা হতে পারত। এভাবে দীর্ঘদিন ধরে রক্তের প্রতিশোধ ও গোত্রীয় যুদ্ধ চলত।
সামান্য ঘটনাও বড় যুদ্ধের কারণ হতে পারত।
 

৫. নারীর অবস্থান
জাহেলি আরব সমাজের একটি অন্ধকার দিক ছিল নারীর প্রতি বৈষম্য।
সব গোত্র ও পরিবারে একই ধরনের আচরণ ছিল না—তবে অনেক ক্ষেত্রে নারীরা উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হতো এবং তাদের সামাজিক অধিকার সীমিত ছিল।
কিছু মানুষের মধ্যে কন্যাসন্তান জন্মকে অপমানজনক মনে করার প্রবণতাও ছিল।
কুরআন এই ভয়াবহ মানসিকতার বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিবাদ করেছে:
“যখন তাদের কাউকে কন্যাসন্তানের সুসংবাদ দেওয়া হয়, তখন তার মুখ কালো হয়ে যায় এবং সে অসহনীয় দুঃখে থাকে।”
—সূরা আন-নাহল ১৬:৫৮
আর জীবন্ত কন্যাশিশুকে মাটিতে পুঁতে ফেলার ব্যাপারে কুরআন জিজ্ঞেস করেছে:
“যখন জীবন্ত কবর দেওয়া কন্যাশিশুকে জিজ্ঞেস করা হবে—কোন অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল?”
—সূরা আত-তাকভীর ৮১:৮–৯
তবে কন্যাশিশু হত্যার প্রথা সর্বত্র বা সব আরবের মধ্যে প্রচলিত ছিল—এমন সরলীকরণও ঠিক নয়।
 

৬. দাসপ্রথা
তৎকালীন আরব সমাজে দাসপ্রথা ছিল।
যুদ্ধবন্দি, ঋণ, বংশগত অবস্থা বা বিভিন্ন কারণে মানুষ দাসে পরিণত হতো।
দাসদের সামাজিক মর্যাদা সাধারণত অত্যন্ত নিচু ছিল।
ইসলাম এসে দাসমুক্তিকে উৎসাহিত করে এবং দাসদের মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার দিকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেয়।
বিলাল (রা.)-এর ঘটনা এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
 

তিনি ছিলেন একজন কৃষ্ণাঙ্গ দাস এবং ইসলামের প্রথম যুগের অন্যতম নির্যাতিত সাহাবি। পরবর্তীতে তিনি ইসলামের অন্যতম সম্মানিত সাহাবিতে পরিণত হন।
এখানে ইসলাম একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনে:
মানুষের মর্যাদা বংশ, গোত্র বা সম্পদের ওপর নয়—আল্লাহভীতির ওপর।
 

৭. মদ ও জুয়া
জাহেলি সমাজে মদ্যপান ও জুয়া প্রচলিত ছিল।
কুরআন পরবর্তীতে মদ ও জুয়াকে মানুষের মধ্যে শত্রুতা সৃষ্টি ও আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার কারণ হিসেবে উল্লেখ করে।
“নিশ্চয়ই মদ, জুয়া, মূর্তি এবং ভাগ্য গণনার শর—এসব শয়তানের অপবিত্র কাজ।”
—সূরা আল-মায়িদাহ ৫:৯০
 

৮. অর্থনৈতিক পরিবেশ
মক্কা ছিল গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র।
কুরাইশরা বাণিজ্যের জন্য বিভিন্ন অঞ্চলে সফর করত। কুরআনে কুরাইশদের শীত ও গ্রীষ্মের বাণিজ্যিক সফরের কথা এসেছে:
“কুরাইশের অভ্যস্ততার কারণে—শীত ও গ্রীষ্মের সফরের অভ্যস্ততার কারণে…”
—সূরা কুরাইশ ১০৬:১–২
মক্কার ভৌগোলিক অবস্থান ও কাবাকে কেন্দ্র করে এর অর্থনৈতিক গুরুত্ব ছিল।
তবে অর্থনৈতিক বৈষম্যও ছিল। ধনী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা সমাজে ব্যাপক ক্ষমতা ভোগ করত, আর দুর্বলদের অধিকার অনেক সময় উপেক্ষিত হতো।
 

৯. সুদের প্রচলন
জাহেলি আরব অর্থনীতিতে সুদ বা রিবা প্রচলিত ছিল।
ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে ঋণের পরিমাণ বাড়িয়ে দেওয়া হতো। এতে দরিদ্র ব্যক্তি আরও বেশি ঋণের ফাঁদে পড়ত।
ইসলাম পরবর্তীতে রিবাকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করে।
 

১০. রাজনৈতিক পরিবেশ
আরবে তখন কোনো শক্তিশালী কেন্দ্রীয় রাষ্ট্র ছিল না।
মূলত বিভিন্ন গোত্র নিজেদের মতো পরিচালিত হতো।
মক্কায় কুরাইশদের প্রভাব ছিল। তাদের মধ্যেও বিভিন্ন গোত্র ও পরিবারের আলাদা নেতৃত্ব ছিল।
কোনো আধুনিক রাষ্ট্রের মতো একক সরকার বা আইনব্যবস্থা পুরো আরবকে নিয়ন্ত্রণ করত না।
ফলে—
গোত্র  নেতৃত্ব আর প্রতিশোধ  যুদ্ধ
এই চক্র অনেক ক্ষেত্রে সমাজকে অস্থির রাখত।
 

১১. আরবের বাইরের পৃথিবীও অস্থির ছিল
নবী ﷺ শুধু আরবের জন্য আসেননি; তাঁর রিসালাত ছিল সমগ্র মানবজাতির জন্য।
তাঁর আগমনের সময় আরবের আশপাশে দুটি বড় সাম্রাজ্য ছিল—
বাইজেন্টাইন/রোমান সাম্রাজ্য
খ্রিস্টান বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য ছিল পশ্চিম এশিয়া ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের বড় শক্তি।
সাসানীয় পারস্য
পারস্য সাম্রাজ্য ছিল আরেকটি বিশাল শক্তি।
এই দুই শক্তির মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে সংঘর্ষ চলেছে।
অর্থাৎ রাসুল ﷺ-এর আবির্ভাব এমন এক সময়ে হয়েছিল যখন বিশ্ব রাজনীতি, ধর্মীয় সংঘাত ও সাম্রাজ্যিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রবল ছিল।
 

১২. খ্রিস্টান ও ইহুদি সমাজ
আরবের বাইরে ইহুদি ও খ্রিস্টান ধর্মের অনুসারী ছিল।
আরব উপদ্বীপেও কিছু ইহুদি ও খ্রিস্টান সম্প্রদায় ছিল, বিশেষ করে ইয়াসরিব/মদিনা ও আরবের কিছু অঞ্চলে।
এছাড়া কিছু মানুষ মূর্তিপূজা থেকে দূরে থেকে ইবরাহিম (আ.)-এর তাওহিদের অনুসন্ধান করতেন। তাদের হানিফ বলা হয়।
 

তবে ইসলামী আকিদা অনুযায়ী, পূর্ববর্তী নবীদের আনা মূল তাওহিদী শিক্ষা সময়ের সঙ্গে বিভিন্নভাবে বিকৃত ও পরিবর্তিত হয়েছিল।
 

১৩. নৈতিকতার অন্ধকারের পাশাপাশি ভালো গুণও ছিল
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার।
জাহেলি আরব সমাজে শুধু খারাপ মানুষ ছিল না।
তাদের মধ্যে অনেক ভালো গুণও ছিল—
অতিথিপরায়ণতা
সাহসিকতা
অঙ্গীকার রক্ষা
বীরত্ব
কবিতা ও ভাষার অসাধারণ দক্ষতা
প্রতিবেশীর সাহায্য
বিপদে সহযোগিতা
বংশপরিচয় সংরক্ষণ
ইসলাম এসে এসব ভালো গুণকে ধ্বংস করেনি; বরং তাওহিদ ও নৈতিকতার ভিত্তিতে সেগুলোকে পরিশুদ্ধ করেছে।
 

১৪. আরবদের ভাষাগত উৎকর্ষ
নবী ﷺ-এর আগমনের সময় আরবি ভাষা ও কবিতা অত্যন্ত উন্নত ছিল।
কাব্য ছিল তাদের সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
কোনো কবি তার কবিতার মাধ্যমে গোত্রের সম্মান বাড়াতে পারত, আবার প্রতিপক্ষকে ব্যঙ্গও করতে পারত।
এই কারণেই কুরআনের ভাষাগত মু‘জিযা তাদের ওপর বিশেষ প্রভাব ফেলেছিল।
 

১৫. কেন এই সময়ে একজন নবীর প্রয়োজন ছিল?
এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
সমাজে ছিল—
শিরক + গোত্রীয় অহংকার + সামাজিক বৈষম্য + অন্যায় + সুদ + মদ + জুয়া + প্রতিশোধ + দুর্বলদের ওপর অত্যাচার।
কিন্তু একই সঙ্গে মানুষ সত্যের সন্ধানও করছিল।
 

এই পরিস্থিতিতে আল্লাহ তাআলা শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ ﷺ-কে পাঠালেন।
কুরআনে বলা হয়েছে:
“আমি আপনাকে সমগ্র বিশ্বের জন্য রহমতস্বরূপই পাঠিয়েছি।”
—সূরা আল-আম্বিয়া ২১:১০৭
আর কুরআন সেই সময়ের অবস্থাকে এভাবে তুলে ধরে:
“তোমরা আগুনের গর্তের কিনারায় ছিলে, অতঃপর তিনি তোমাদের তা থেকে রক্ষা করলেন।”
—সূরা আলে ইমরান ৩:১০৩

Related Article
comment
মোঃ মনির হোসেন বকাউল
29-Sep-23 | 10:09

Good news

মোঃ মনির হোসেন বকাউল
10-Dec-23 | 04:12

Good

আঃ হালিম সরদার
05-Aug-26 | 06:08

wonderful news